মন-নিয়ন্ত্রণের বাইরে: ওসিডি-র কবলে
কখনও দরজা বন্ধ করার পর মনে হয়েছে, “ঠিকমতো লক করেছি তো?” আবার গিয়ে দেখে নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। অনেকেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করেন, জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখেন বা কোনো কাজ করার আগে বারবার নিশ্চিত হন। কিন্তু যখন অনিচ্ছাকৃত চিন্তা বারবার মাথায় আসতে থাকে এবং সেই চিন্তার অস্বস্তি কমাতে একজন মানুষকে একই কাজ বারবার করতে হয়, তখন বিষয়টি শুধু স্বভাব বা অভ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি হতে পারে OCD বা Obsessive Compulsive Disorder।
OCD একটি
মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা, যেখানে অনিয়ন্ত্রিত ও বারবার ফিরে
আসা চিন্তা, তাড়না বা মানসিক ছবি
এবং পুনরাবৃত্ত আচরণ দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ অনেক সময় এতটাই সময়সাপেক্ষ ও কষ্টদায়ক হয়
যে স্বাভাবিক জীবনযাপন, পড়াশোনা, কাজ, সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন দায়িত্বে প্রভাব পড়ে।
OCD আসলে কী?
OCD শব্দটিকে
দুটি ভাগে বোঝা যায়। প্রথমটি হলো Obsession,
অর্থাৎ এমন অনিচ্ছাকৃত ও বারবার ফিরে
আসা চিন্তা, তাড়না বা মানসিক ছবি,
যা ব্যক্তির মধ্যে ভয়, উদ্বেগ, অস্বস্তি বা বিতৃষ্ণা তৈরি
করতে পারে।
দ্বিতীয়টি
হলো Compulsion,
অর্থাৎ সেই অস্বস্তি কমানোর জন্য বারবার কোনো শারীরিক কাজ করা অথবা মনে মনে কোনো নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা।
ধরা
যাক, একজনের মনে বারবার আসছে যে দরজা ঠিকমতো
বন্ধ হয়নি। তিনি জানেন যে দরজাটি বন্ধ
করেছেন, তবু সন্দেহটি দূর হচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত তিনি দরজাটি আবার পরীক্ষা করলেন। কিছুক্ষণের জন্য স্বস্তি পেলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার একই
সন্দেহ ফিরে এল এবং আবার
পরীক্ষা করার প্রয়োজন অনুভব করলেন।
এভাবেই
একটি চক্র তৈরি হতে পারে।
অনিচ্ছাকৃত
চিন্তা
→ উদ্বেগ
বা
অস্বস্তি
→ বাধ্যতামূলক
কাজ
→ সাময়িক
স্বস্তি
→ আবার
চিন্তা
ফিরে
আসা
OCD-এর
ক্ষেত্রে এই চক্রটি বারবার
চলতে থাকে।
সবসময় কি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার
সঙ্গে OCD-এর সম্পর্ক থাকে?
না।
এটি OCD সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি।
পরিষ্কার
পরিচ্ছন্নতা বা জীবাণুর ভয়
OCD-এর একটি সম্ভাব্য ধরন হলেও এই সমস্যার প্রকাশ
অনেক রকম হতে পারে। কারও অতিরিক্ত হাত ধোয়ার প্রবণতা থাকতে পারে, আবার কেউ বারবার দরজা, গ্যাসের চুলা বা বৈদ্যুতিক সুইচ
পরীক্ষা করতে পারেন। কারও মনে হতে পারে কোনো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হারিয়ে ফেলেছেন। কেউ আবার জিনিসপত্র নির্দিষ্ট ক্রমে না থাকলে তীব্র
অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন।
কিছু
মানুষের ক্ষেত্রে শারীরিক আচরণের চেয়ে মানসিক
compulsion বেশি
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যেমন মনে মনে একই বাক্য বারবার বলা, কোনো ঘটনা বারবার বিশ্লেষণ করা বা নিজেকে বারবার
আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা।
NIMH-এর তথ্য অনুযায়ী OCD-এর obsession-এর মধ্যে জীবাণু বা দূষণের ভয়, কিছু ভুলে যাওয়ার ভয়, নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়, ক্ষতি সম্পর্কিত অনিচ্ছাকৃত চিন্তা এবং জিনিসপত্র নিখুঁতভাবে সাজিয়ে রাখার প্রবণতা থাকতে পারে।
সাধারণ চিন্তা আর OCD-এর চিন্তার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
মানুষের
মনে অদ্ভুত, ভয়ংকর বা অপ্রত্যাশিত চিন্তা
আসতেই পারে। এমন চিন্তা আসা মানেই OCD নয়।
পার্থক্যটি
অনেকটা নির্ভর করে সেই চিন্তা একজন মানুষের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে তার ওপর।
OCD-এর
ক্ষেত্রে চিন্তাটি সাধারণত অনিচ্ছাকৃতভাবে ফিরে আসে এবং ব্যক্তি সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে কষ্ট পান। অনেক সময় তিনি বুঝতেও পারেন যে ভয় বা
সন্দেহটি অতিরঞ্জিত, তবু তার মনের চাপ কমে না।
Compulsion করার
পর সাধারণত আনন্দ পাওয়ার বদলে সাময়িক স্বস্তি আসে। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিছুক্ষণ
পর আবার সন্দেহ বা ভয় ফিরে
আসতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে এসব চিন্তা ও আচরণ প্রতিদিন
এক ঘণ্টারও বেশি সময় দখল করে এবং দৈনন্দিন জীবনে উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি করে।
OCD-এর লক্ষণ কী কী?
OCD-এর
লক্ষণ ব্যক্তি অনুযায়ী আলাদা হতে পারে। তবে কিছু লক্ষণ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
বারবার
হাত ধোয়া বা পরিষ্কার করার
প্রয়োজন অনুভব করা, দরজা বা তালা বারবার
পরীক্ষা করা, গ্যাস বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র
নিয়ে বারবার নিশ্চিত হওয়া, কোনো জিনিস নির্দিষ্টভাবে সাজানো না থাকলে তীব্র
অস্বস্তি হওয়া, মনে মনে সংখ্যা গোনা, একই শব্দ বা বাক্য বারবার
বলা এবং কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও বারবার সেটি নিয়ে সন্দেহ করা এর মধ্যে থাকতে
পারে।
এর
পাশাপাশি এমন কিছু অনিচ্ছাকৃত চিন্তাও থাকতে পারে, যা ব্যক্তি নিজেই
ভয়ংকর, লজ্জাজনক বা নিজের মূল্যবোধের
সম্পূর্ণ বিপরীত বলে মনে করেন।
এখানে
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মনে
কোনো
চিন্তা
আসা
আর
সেই
চিন্তা
অনুযায়ী
কাজ
করতে
চাওয়া
এক
জিনিস
নয়।
OCD-এর intrusive
thoughts অনেক সময় ব্যক্তির প্রকৃত ইচ্ছা বা চরিত্রের সঙ্গে
কোনো সম্পর্ক রাখে না। এই কারণেই অনেক
মানুষ নিজের উপসর্গ নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পান বা ভয় পান
যে অন্যরা তাদের ভুল বুঝবে।
কেন OCD হয়?
OCD-এর
একটিমাত্র কারণ নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। গবেষণায় জেনেটিক বা পারিবারিক প্রভাব,
মস্তিষ্কের কার্যপ্রক্রিয়ার পার্থক্য এবং বিভিন্ন পরিবেশগত বা জীবনের অভিজ্ঞতার
সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ উপসর্গকে বাড়িয়ে দিতে পারে।
অর্থাৎ
OCD-কে শুধু “ইচ্ছাশক্তির অভাব” বা “বেশি চিন্তা করার অভ্যাস” বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
একজন
মানুষ চাইলেই সবসময় নিজের OCD-এর চিন্তা বন্ধ
করে দিতে পারেন না। একই কারণে তাকে “এত ভাবছ কেন?”
বা “একবার করলেই তো হয়েছে” বলা
সমস্যার সমাধান করে না।
OCD কি শিশুদেরও হতে পারে?
হ্যাঁ।
OCD শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের সমস্যা নয়। শিশু ও কিশোরদের মধ্যেও
এর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় শিশুরা নিজের আচরণকে অস্বাভাবিক মনে নাও করতে পারে। বরং তারা ভাবতে পারে, কোনো নির্দিষ্ট কাজ না করলে খারাপ
কিছু ঘটবে।
ফলে
বাবা মা বা শিক্ষকরা
প্রথমে বিষয়টিকে জেদ, দুষ্টুমি, অতিরিক্ত খুঁতখুঁতে স্বভাব অথবা অদ্ভুত অভ্যাস হিসেবে দেখতে পারেন।
শিশুর
আচরণে হঠাৎ বড় পরিবর্তন, অস্বাভাবিকভাবে
দীর্ঘ সময় ধরে হাত ধোয়া, বারবার একই প্রশ্ন করা, ঘুমানোর আগে নির্দিষ্ট ritual অনুসরণ করা বা কোনো কাজ
নির্দিষ্টভাবে না হলে তীব্র
অস্বস্তি দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
OCD কি সম্পূর্ণভাবে ভালো হয়?
OCD দীর্ঘস্থায়ী
হতে পারে এবং অনেকের ক্ষেত্রে উপসর্গ সময়ের সঙ্গে কমবেশি হতে পারে। তবে এর অর্থ এই
নয় যে একজন মানুষ
সারাজীবন একই মাত্রার সমস্যার মধ্যে থাকবেন।
সঠিক
চিকিৎসা ও সহায়তার মাধ্যমে
OCD-এর উপসর্গ উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু চিন্তা বন্ধ করা নয়, বরং সেই চিন্তার কারণে তৈরি হওয়া বাধ্যতামূলক আচরণের চক্র ভাঙা এবং ব্যক্তিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করা।
OCD-এর চিকিৎসা কী?
OCD-এর
চিকিৎসায় psychotherapy,
বিশেষ করে Cognitive
Behavioral Therapy বা
CBT, গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা পালন করে। এর একটি বিশেষ
পদ্ধতি হলো Exposure
and Response Prevention বা
ERP।
ERP-তে
প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টের সহায়তায় ধীরে ধীরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে শেখানো হয়, যা obsession তৈরি করে। একই সঙ্গে সেই পরিস্থিতির পরে স্বাভাবিকভাবে যে compulsion করার তাগিদ আসে, সেটি না করার অনুশীলন
করা হয়।
প্রথম
দিকে এটি অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু ধীরে ধীরে মস্তিষ্ক শিখতে পারে যে প্রতিবার compulsion না করলেও
উদ্বেগ সামলানো সম্ভব।
কিছু
মানুষের ক্ষেত্রে ওষুধও প্রয়োজন হতে পারে। OCD-এর চিকিৎসায় চিকিৎসকের
পরামর্শ অনুযায়ী কিছু antidepressant, বিশেষ করে SSRI শ্রেণির ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ওষুধের প্রয়োজন, মাত্রা এবং কতদিন ব্যবহার করতে হবে তা ব্যক্তিভেদে আলাদা
হতে পারে। তাই নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা
উচিত নয়।
কিছু
ক্ষেত্রে
psychotherapy এবং
medication একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।
পরিবারের ভূমিকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
OCD থাকা
একজন মানুষের জন্য পরিবারের বোঝাপড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাকে উপহাস করা, ইচ্ছাশক্তির অভাবের জন্য দোষ দেওয়া বা বারবার “এটা
কিছুই নয়” বলা সমস্যাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
আবার পরিবারের সদস্যরা যদি প্রতিবার তার compulsion-এ সহযোগিতা করেন, তাহলে অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই চক্রটিও শক্তিশালী হতে পারে। তাই কীভাবে সহায়তা করা উচিত, সেটি একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জানা ভালো।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত?
যদি
বারবার ফিরে আসা চিন্তা বা আচরণ আপনার
দিনের উল্লেখযোগ্য সময় নিয়ে নেয়, কাজ বা পড়াশোনায় সমস্যা
তৈরি করে, ঘুম বা সম্পর্ককে প্রভাবিত
করে, বাইরে যাওয়া বা স্বাভাবিক কাজ
এড়িয়ে চলতে বাধ্য করে অথবা নিজের চিন্তা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ
করতে না পেরে আপনি
প্রচণ্ড মানসিক চাপ অনুভব করেন, তাহলে একজন qualified mental
health professional-এর
সঙ্গে কথা বলা যুক্তিযুক্ত।
নিজে
নিজে রোগ নির্ণয় না করে একজন
psychiatrist, clinical psychologist বা
উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর মূল্যায়ন নেওয়াই নিরাপদ।
কারণ একই ধরনের কিছু উপসর্গ অন্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গেও দেখা যেতে পারে। সঠিক diagnosis চিকিৎসার পথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
OCD শুধু
বারবার হাত ধোয়া, দরজা পরীক্ষা করা কিংবা অতিরিক্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকার নাম নয়। এর গভীরে থাকতে
পারে ভয়, সন্দেহ, অপরাধবোধ, অস্বস্তি এবং এমন কিছু অনিচ্ছাকৃত চিন্তা, যেগুলো একজন মানুষ নিজের কাছেই ব্যাখ্যা করতে পারেন না।
সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, OCD নিয়ে লজ্জা পাওয়ার প্রয়োজন নেই। এটি একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং এর জন্য কার্যকর
চিকিৎসা রয়েছে।
কেউ
যদি নিজের মধ্যে এমন লক্ষণ দেখতে পান, তাহলে বিষয়টি লুকিয়ে না রেখে সাহায্য
চাওয়াই ভালো। চিকিৎসা শুরু করতে দেরি না করাই অনেক
সময় জীবনকে আবার নিজের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।
তথ্যসূত্র:
National Institute of Mental Health (NIMH) এবং
NHS-এর OCD বিষয়ক চিকিৎসা ও তথ্যভিত্তিক নির্দেশিকা।

Comments
Post a Comment